বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

🌙 রাত ২টা ১৭-এর দরজা

 


রাত তখন ২টা ১৬ মিনিট।

অর্ক ঘুমিয়ে ছিল না।

দক্ষিণপাড়ার পুরনো ডাকবাংলোয় চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তার ঘুমটা কেমন যেন বদলে গিয়েছিল। জায়গাটা দিনের বেলায় যতটা শান্ত, রাত নামলেই ততটাই অস্বস্তিকর হয়ে উঠত।

ডাকবাংলোর বয়স প্রায় একশো বছর।

লাল ইটের দেয়াল, কাঠের লম্বা বারান্দা, টিনের ছাদ আর চারদিকে বিশাল গাছপালা। আশেপাশে প্রায় আধ কিলোমিটারের মধ্যে আর কোনো বাড়ি নেই।

অর্কের কাজ ছিল ডাকবাংলোটার দেখাশোনা করা এবং ডাকঘরের নথি ও সরকারি কাগজপত্র নিরাপদে রাখা।

প্রথম দু'দিন কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি।

তৃতীয় রাতেই সে প্রথম শব্দটা শুনেছিল।

ঠক।

অর্ক চোখ খুলেছিল।

কয়েক সেকেন্ড পর—

ঠক... ঠক...

শব্দটা আসছিল করিডোরের শেষ প্রান্ত থেকে।

সেখানে একটা কাঠের দরজা ছিল।

দরজাটার ওপর পুরনো কালিতে লেখা—

কক্ষ নং ৭

অর্ক তখন ভেবেছিল হয়তো বাতাসে দরজাটা নড়ছে।

কিন্তু সকালে গিয়ে দেখে দরজাটা বাইরে থেকে মোটা শিকল দিয়ে বাঁধা।

সে এলাকার বৃদ্ধ কেয়ারটেকার হরিপদকে জিজ্ঞেস করেছিল,

“ও ঘরটা বন্ধ কেন?”

হরিপদ কিছুক্ষণ অর্কের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিল,

“ও ঘর নিয়ে প্রশ্ন করবেন না বাবু।”

“কেন?”

বৃদ্ধ আর কিছু বলেনি।

শুধু বলেছিল,

“রাতের পরে ওই দিকের করিডোরে যাবেন না।”

অর্ক হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল।

কিন্তু সেদিন রাত থেকেই তার কৌতূহল বাড়তে শুরু করে।

আর আজ—

রাত ২টা ১৬ মিনিটে—

সেই শব্দ আবার এল।

ঠক।

অর্ক বিছানা থেকে উঠে বসল।

তার ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে ২টা ১৭-তে পৌঁছল।

ঠিক তখন—

ঠক... ঠক... ঠক...

এবার শব্দটা অনেক জোরে।

অর্ক দরজা খুলে বাইরে বেরোল।

লম্বা করিডোরটা অন্ধকার।

শুধু শেষে একটা ছোট হলুদ বাল্ব জ্বলছে।

আর তার নিচেই দাঁড়িয়ে আছে কক্ষ নম্বর ৭।

অর্ক ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

শিকলটা দরজায় ঝুলছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—

শিকলটা বাইরে থেকেই লাগানো থাকার কথা, অথচ দরজার নিচ দিয়ে ভেতর থেকে আলো বের হচ্ছে।

অর্ক নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।

সে মোবাইলের flashlight জ্বালাল।

দরজার হাতলে হাত রাখল।

হাতলটা বরফের মতো ঠান্ডা।

ঠিক তখন ভেতর থেকে একটা মেয়ের গলা শোনা গেল—

“অর্ক...”

সে হাত সরিয়ে নিল।

তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

ভেতরের মানুষটা তার নাম জানে কীভাবে?

আবার গলা এল—

“দরজাটা খোলো...”

অর্ক পিছিয়ে গেল।

“কে?”

কোনো উত্তর নেই।

শুধু—

ঠক... ঠক...

তারপর অদ্ভুতভাবে সব শব্দ বন্ধ হয়ে গেল।

অর্ক দৌড়ে নিজের ঘরে ফিরে এল।

সারারাত আর ঘুমোয়নি।

সকালেই হরিপদকে সব বলল।

বৃদ্ধের মুখ সাদা হয়ে গেল।

“আপনি ওর গলা শুনেছেন?”

“হ্যাঁ।”

“আপনার নাম ধরে?”

অর্ক মাথা নাড়ল।

হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“তাহলে ব্যাপারটা ভালো নয়।”

“কে আছে ওই ঘরে?”

বৃদ্ধ এবার ধীরে ধীরে বলল,

“কেউ নেই।”

অর্ক হেসে ফেলল।

“তাহলে রাতে কথা বলে কে?”

হরিপদ উত্তর দিল,

“সেই কথাটাই কেউ আজ পর্যন্ত বুঝতে পারেনি।”


পুরনো রেজিস্টার

সেদিন বিকেলে অর্ক অফিসের পুরনো রেকর্ড ঘাঁটতে গিয়ে একটা রেজিস্টার পেল।

পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে।

তারিখ—

১৭ আগস্ট, ২০০৪।

একটা নোটে লেখা:

“রাত ২টা ১৭ মিনিটে কক্ষ ৭-এর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ পাওয়া যায়। কক্ষে থাকা ব্যক্তি নিখোঁজ।”

নিচে নাম—

মাধবী সেন।

অর্ক অবাক হয়ে গেল।

কারণ মাধবী সেনের নামের পাশে আর কোনো তথ্য নেই।

না ঠিকানা।

না আত্মীয়ের নাম।

না মৃত্যুর রেকর্ড।

শুধু শেষ লাইনে লেখা:

“পরদিন সকালেও কক্ষ ৭-এর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল।”

অর্ক রেজিস্টারটা নিয়ে হরিপদের কাছে গেল।

“মাধবী সেন কে?”

হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আমার মেয়ের নাম ছিল মাধবী।”

অর্ক থমকে গেল।

“আপনার মেয়ে?”

বৃদ্ধ মাথা নিচু করল।

“সতেরো বছর আগে ওই ঘর থেকেই সে হারিয়ে যায়।”

ঘরটা যেন হঠাৎ আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।

অর্ক ধীরে বলল,

“তাহলে পুলিশ?”

“এসেছিল।”

“খুঁজে পায়নি?”

“কাউকে পায়নি।”

“দরজা?”

হরিপদ বলল,

“ভিতর থেকে বন্ধ ছিল।”


দ্বিতীয় রাত

অর্ক সিদ্ধান্ত নিল আজ রাতে সে ভয় পাবে না।

রাত ১টা ৫০-এ সে করিডোরে গিয়ে বসে রইল।

২টা ১০।

২টা ১৫।

২টা ১৬।

তার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল।

তারপর—

ঘড়িতে ২টা ১৭।

বাল্বটা একবার নিভে গেল।

আবার জ্বলল।

আর কক্ষ ৭-এর শিকলটা—

নিজে থেকেই খুলে মাটিতে পড়ে গেল।

অর্ক জমে গেল।

দরজাটা ধীরে ধীরে খুলল।

ভেতরে একটা ছোট টেবিল।

একটা পুরনো কেরোসিনের বাতি।

একটা কাঠের চেয়ার।

আর দেয়ালে একটা বড় আয়না।

ঘরের মধ্যে ধুলো নেই।

মনে হচ্ছিল কেউ যেন প্রতিদিন ঘরটা পরিষ্কার করে।

অর্ক এক পা ভেতরে দিল।

তারপর দ্বিতীয় পা।

দরজাটা পিছনে বন্ধ হয়ে গেল।

ধাম!

সে ছুটে গিয়ে দরজার হাতল ধরল।

খুলল না।

ঠিক তখন আয়নার দিকে তার চোখ গেল।

আয়নায় সে নিজেকে দেখতে পাচ্ছে।

কিন্তু তার পেছনে—

একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে।

সাদা পোশাক।

লম্বা চুল।

মুখ নিচু।

অর্ক ভয়ে ঘুরে দাঁড়াল।

কেউ নেই।

আবার আয়নায় তাকাল।

মেয়েটা এবার আরও কাছে।

অর্ক ফিসফিস করে বলল,

“মাধবী?”

মেয়েটা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

তারপর ঠোঁট না নেড়েই কণ্ঠ শোনা গেল—

“তুমি দেরি করে ফেলেছ।”

অর্ক কেঁপে উঠল।

“কিসের জন্য?”

মেয়েটা আয়নার ভেতর একটা দরজার দিকে আঙুল দেখাল।

অর্ক তখন বুঝতে পারল—

আয়নায় ঘরের যে অংশটা দেখা যাচ্ছে, সেখানে আরেকটা দরজা আছে।

বাস্তবে সেই দেয়ালে কোনো দরজা নেই।

অর্ক হাত বাড়িয়ে আয়নাটা ছুঁল।

আয়নার কাচ বরফের মতো ঠান্ডা।

তার আঙুল কাচের ভেতর ঢুকে গেল।

সে চমকে হাত সরিয়ে নিল।

তারপর—

আয়নার ভেতরের দরজাটা খুলে গেল।

অন্ধকার।

অন্ধকারের মধ্যে একটা ছোট আলো।

আর সেখানে একটা পুরনো চিঠি পড়ে আছে।

অর্ক হাত বাড়িয়ে চিঠিটা বের করল।

চিঠির ওপর লেখা—

“বাবার জন্য।”

অর্ক বুঝতে পারল।

এটা মাধবীর চিঠি।

চিঠিতে লেখা ছিল—

“বাবা,

আমি জানি তুমি এই ঘরের কথা কাউকে বলবে না।

কারণ তুমি আমাকে বিশ্বাস করবে না।

এই ঘরের দরজা বাইরে নয়—

সময়ের ভেতরে খোলে।

প্রতিদিন রাত ২টা ১৭ মিনিটে কয়েক মুহূর্তের জন্য এই ঘর অন্য এক সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়।

আমি সেই সময়ের ভেতরে আটকে গেছি।

আমাকে খুঁজতে এসো না।

কারণ একদিন তুমি যে মানুষটাকে খুঁজতে যাবে—

সে হয়তো আর তোমার সময়ের মানুষ থাকবে না।”

অর্ক চিঠি পড়তে পড়তে বুঝতে পারল না কখন পেছনে কেউ দাঁড়িয়েছে।

মেয়েটার গলা এবার একদম তার কানের পাশে—

“বাবা আমাকে খুঁজতে এসেছিল।”

অর্ক ধীরে ঘুরল।

মাধবী সামনে দাঁড়িয়ে।

“তারপর?”

মেয়েটা বলল,

“সে-ও থেকে গেল।”

অর্কের মুখ শুকিয়ে গেল।

“কোথায়?”

মাধবী আয়নার দিকে তাকাল।

“ওপারে।”

অর্ক আবার আয়নার দিকে তাকাল।

এইবার সেখানে শুধু মাধবী নয়—

একজন বৃদ্ধ মানুষও দাঁড়িয়ে।

অর্ক সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারল।

হরিপদ।

কিন্তু হরিপদ তো এখনো বেঁচে আছে।

তাহলে আয়নায় যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে সে কে?

মাধবী ফিসফিস করে বলল—

“সময় সবসময় এক দিকে যায় না।”

ঠিক তখন ঘড়ির শব্দ হলো।

টিক।

২টা ১৮।

আয়না ভেঙে চৌচির হয়ে গেল।

অর্ক কিছুই বুঝে ওঠার আগেই ঘরের বাতি নিভে গেল।


সকাল

পরদিন সকালে হরিপদ অর্ককে করিডোরে পড়ে থাকতে দেখল।

কক্ষ ৭-এর দরজা আবার বন্ধ।

শিকল বাইরে ঝুলছে।

অর্ক ধীরে ধীরে চোখ খুলল।

হরিপদ বলল,

“সব দেখেছেন?”

অর্ক কোনো উত্তর দিল না।

শুধু বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনার মেয়ে আপনাকে খুঁজছে।”

হরিপদের চোখে জল এসে গেল।

“আমি জানি।”

অর্ক থমকে গেল।

“আপনি জানেন?”

হরিপদ ধীরে বলল,

“কারণ গত সতেরো বছর ধরে প্রতিরাতে ২টা ১৭ মিনিটে আমি ওর গলা শুনি।”

অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।

“তাহলে আমাকে কেন বললেন না?”

হরিপদ বলল,

“কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম।”

“কিসের?”

বৃদ্ধ কক্ষ ৭-এর দিকে তাকিয়ে বলল—

“আপনি যদি দরজাটা খুলে ফিরে আসেন, তাহলে পরের বার হয়তো আর একা ফিরবেন না।”

সেই মুহূর্তে ঘড়িতে সময় ছিল—

২টা ১৭।

কিন্তু সকাল ৮টা।

অর্ক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রইল।

ঘড়ির কাঁটা নড়ছে না।

আর কক্ষ ৭-এর ভেতর থেকে আবার ভেসে এল—

ঠক... ঠক... ঠক...


শেষ হয়নি...

কিছু দরজা বন্ধ রাখাই ভালো।
কারণ সব দরজার ওপারে জায়গা থাকে না—কখনও কখনও সময়ও থাকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

🌙 রাত ২টা ১৭-এর দরজা

  রাত তখন ২টা ১৬ মিনিট । অর্ক ঘুমিয়ে ছিল না। দক্ষিণপাড়ার পুরনো ডাকবাংলোয় চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তার ঘুমটা কেমন যেন বদলে গিয়েছিল। জায়...

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ