Monday, September 7, 2020

জয় পরাজয়

 জয় পরাজয়


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


রাজকন্যার নাম অপরাজিতা। উদয়নারায়ণের সভাকবি শেখর তাহাকে কখনাে চক্ষেও দেখেন নাই, কিন্তু যে দিন কোনাে নৃতন কাব্য রচনা করিয়া সভাতলে বসিয়া রাজাকে শুনাইতেন সে দিন কণ্ঠস্বর ঠিক এতটা উচ্চ করিয়া পড়িতেন যাহাতে তাহা সেই সুউচ্চ গৃহের উপরিতলের বাতায়নবর্তিনী অদৃশ্য শ্রোত্রীগণের কর্ণপথে প্রবেশ করিতে পারে। যেন তিনি কোনাে-এক অগম্য নক্ষত্রলােকের উদ্দেশে আপনার সংগীতােচ্ছাস প্রেরণ করিতেন যেখানে জ্যোতিষ্ক মন্ডলীর মধ্যে তাঁহার জীবনের একটি অপরিচিতি শুভ গ্রহ অদৃশ্য মহিমায় বিরাজ করিতেছেন। কখনাে ছায়ার মতন দেখিতে পাইতেন, কখনাে নূপুরশিঞ্জনের মতন শুনা বসিয়া বসিয়া মনে মনে ভাবিতেন, সে কেমন দুইখানি চরণ যাহাতে সেই যাইত;


সােনার নূপুর বাঁধা থাকিয়া তালে তালে গান গাহিতেছে। সেই দুইখানি রক্তিম শুভ্র


কোমল চরণতল প্রতি পদক্ষপে কী সৌভাগ্য কী অনুগ্রহ কী করুণার মতাে করিয়া


পৃথিবীকে স্পর্শ করে। মনের মধ্যে সেই চরণদুটি প্রতিষ্ঠ করিয়া কবি অবসরকালে


সেইখানে আসিয়া লুটাইয়া পড়িত এবং সেই নূপুরশিঞ্জনের সুরে আপনার গান বাধিত। কিন্তু যে ছায়া দেখিয়াছিল, সে নূপুর শুনিয়াছিল, সে কাহার ছায়া, কার নূপুর এমন তর্ক এবং সংশয় তাহার ভক্তি হৃদয়ে কখনাে উদয় হয় না। রাজকন্যার দাসী মঞ্জরী যখন ঘাটে যাইত শেখরের ঘরের সম্মুখ দিয়া তাহার পথ ছিল। আসিতে যাইতে কবির সঙ্গে তাহার দুটো কথা না হইয়া যাইত না। তেমন নির্জন দেখিলে সে সকাল সন্ধ্যায় শেখরের ঘরের মধ্যে গিয়াও বসিত। যতবার সে ঘাটে যাইত ততবার যে তাহার আবশ্যক ছিল এমনও বােধ হইত না, যদি-বা আবশ্যক ছিল এমন হয় কিন্তু ঘাটে যাইবার সময় উহারই মধ্যে একটু বিশেষ যত্ন করিয়া


একটি রঙিন কাপড় এবং কানে দুইটা আত্রমুকুল পরিবার কোনাে উচিত কারণ


পাওয়া যাইত না।

জয় পরাজয়


লােকে হাসাহাসি কানাকানি করিত। লােকের কোনাে অপরাধ ছিল না। মঞ্জরী দেখিলে শেখর বিশেষ আনন্দলাভ করিতেন।তাহা গােপন করিতেও তাহার তেমন প্রয়াস ছিল না।


তাহার নাম ছিল মঞ্জরী; বিবেচনা করিয়া দেখিলে, সাধারণত লােকের পক্ষে সেই নামই যথেষ্ট ছিল, কিন্তু শেখর আবার আরাে একটু কবিত্ব করিয়া তাহাকে বসন্তমঞ্জরী বলিতেন। লােকে শুনিয়া বলিতে "আ সর্বনাশ!'—


আবার কবির বসন্তবর্ণনার মধ্যে মঞ্জল বঞ্জল মঞ্জরী এমনতর অনুপ্রাস ও মাঝে


মাঝে পাওয়া যাইত। এমন কি জনবর রাজার কানেও উঠিয়াছিল। রাজা তাহার কবির এইরূপ রসাধিক্যের পরিচয় পাইয়া বড়ােই আমােদ বােধ করিতেন তাহা লইয়া কৌতুক করিতেন, শেখরও তাহাতে যােগ দিতেন।


রাজা হাসিয়া প্রশ্ন করিতেন, “ভ্রমর কি কেবল বসন্তের রাজসভায় গান।


গায়।”


কবি উত্তর দিতেন, “না, পুষ্পমঞ্জরী মধু ও খাইয়া থাকে।” এমনি করিয়া সকলেই হাসিত, আমােদ করিত, বোধকরি অন্তঃপুরে রাজকন্যা অপরাজিতাও মঞ্জরীকে লইয়া মাঝে মাঝে উপহাস করিয়া থাকিবেন। মঞ্জুরী তাহাতে


অসন্তষ্ট হইত না।


এমনি করিয়া সত্যে মিথ্যায় মিশাইয়া মানুষের জীবন একরকম করিয়া কাটিয়া যায় খানিকটা বিধাতা গড়েন, খানিকটা আপনি গড়ে, খানিকটা পাঁচজনে গড়িয়া দেয় । জীবনটা একটা পাঁচমিশালি রকমের জোড়াতাড়া প্রকৃত এবং অপ্রকৃত, কাল্পনিক এবং বাস্তবিক।


কেবল কবি যে গানগুলি গাহিতেন তাহাই সত্য এবং সম্পূর্ণ। গানের বিষয় সেই রাধা এবং কৃষ্ণ—সেই চিরন্তন নর এবং চিরন্তন নারী, সেই অনাদি দুঃখ এবং এবং অনন্ত সুখ। সেই গানেই তাঁহার যথার্থ নিজের কথা ছিল এবং সেই গানের যাথার্থ্য অমরাপুরের রাজা হইতে দীনদুঃখী প্রজা পর্যন্ত সকলেই আপনার হৃদয়ে হৃদয়ে পরীক্ষা করিয়াছিল। তাহার গান সকলেরই মুখে। জ্যোৎস্না উঠিলেই, একটু দক্ষিণা বাতাসের আভাস দিলেই অমনি দেশের চতুর্দিকে কত কানন,কত পথ, কত নৌকা, কত বাতায়ন, কত প্রাঙ্গণ হইতে তাহার রচিত গান উচ্ছাসিত হইয়া উঠিত -- তাহার খ্যাতির আর সীমা ছিল না।


এইভাবে অনেক দিন কাটিয়া গেল। কবি কবিতা লিখতেন, রাজা শুনিতেন,


রাজসভার লােক বাহবা দিত, মঞ্জরী ঘাটে আসিত এবং অন্তঃপুরের বাতায়ন হইতে কখনাে কখনাে একটা ছায়া পড়িত, কখনাে কখনাে একটা নূপুর শুনা যাইত। এমন সময়ে দাক্ষিণাত্য হইতে এক দিগবিজয়ী কবি শার্দুলবিক্রীড়িত ছন্দে রাজার স্তবগান করিয়া রাজসভায় এসে দাঁড়াইলেন। তিনি স্বদেশ হইতে বাহির


হইয়া পথিমধ্যে সমস্ত রাজকবিদিগকে পরাস্ত করিয়া অবশেষে অমরাপুরে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন।


রাজা পরম সমাদরের সহিত কহিলেন, “এহি, এহি।” কবি পুণ্ডরীক দত্ত ভরে কহিলেন, "যুদ্ধং দেহি।


রাজার মান রাখিতে হইবে, যুদ্ধ দিতে হইবে কিন্তু, কাব্যযুদ্ধ যে কিরূপ হইতে পারে শেখরের সে সম্বন্ধে ভালারপ ধারণা ছিল না। তিনি অত্যন্ত চিন্তিত ও শঙ্কিত হইয়া উঠিলেন। রাত্রে নিদ্রা হইল না। যশস্বী পুণ্ডরীকের দীর্ঘ বলিষ্ঠ দেহে, সতীক্ষ্ম বক্র নাসা এবং দর্পোদ্ধত উন্নত মস্তক দিগবিদিক অঙ্কিত দেখিতে লাগিলেন। প্রাতঃকালে কম্পিতহৃদয়ে কবি রণক্ষেত্রে আসিয়া প্রবেশ করিলেন। প্রত্যুষ হইতে সভাতল লােকে পরিপূর্ণ হইয়া গেছে, কলরবের সীমা নাই;নগরে আরসমস্ত কাজকর্ম একেবারে বন্ধ।


কবি শেখর বহুকষ্টে মুখে সহাস্য প্রফুল্লতার আয়ােজন করিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী কবি পুণ্ডরীককে নমস্কার করিলেন; পুণ্ডরীক প্রচণ্ড অবহেলাভরে নিতান্ত ইঙ্গিতমাত্রে নমস্কার ফিরাইয়া দিলেন এবং নিজের অনুবর্তী ভক্তবৃন্দের দিকে চাহিয়া হাসিলেন। শেখর একবার অন্তঃপুরের বাতায়নের দিকে কটাক্ষ নিক্ষেপ করিলেন। বুঝিতে পারিলেন, সেখান হইতে আজ শত শত কৌতুহলপূর্ণ কৃষ্ণতারকার ব্যগ্রদৃষ্টি এই জনতার উপরে অস্ত্র নিপতিত হইতেছে। একবার একাগ্রভাবে চিত্তকে সেই ঊর্ধ্বলোকে উৎক্ষিপ্ত করিয়া আপনার জয়লক্ষ্মীকে বন্দনা করিয়া আসিলেন; মনে মনে কহিলেন, আমার যদি আজ জয় হয় তবে, হে দেবী, হে অপরাজিতা, তাহাতে তােমারই নামের সার্থকতা হইবে।


তুরী ভেরী বাজিয়া উঠিল জয়ধ্বনি করিয়া সমাগত সকলে উঠিয়া দাঁড়াইল। শুক্লাবসন রাজা উদয়নারায়ণ শরৎ প্রভাতের শুভ্র মেঘ রাশির ন্যায় ধীরগমনে সভায় প্রবেশ করিলেন এবং সিংহাসনে উঠিয়া বসিলেন। পুণ্ডরীক উঠিয়া সিংহাসনের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইলেন। বৃহৎ সভা স্তব্ধ হইয়া গেল।


বক্ষ বিশ্ফারিত করিয়া গ্রীবা ঈষৎ উধ্বে হেলাইয়া, বিরাটমুর্তি পুনডরীক গম্ভীর স্বরে উদয়নারায়ণের স্তব পাঠ করিতে আরম্ভ করিলেন। কণ্ঠস্বর ঘরে ধরে না— বৃহৎ সভাগৃহের চারি দিকের ভিত্তিতে স্তন্তে ছাদে সমুদ্রের তরঙ্গের মতাে গম্ভীর মন্দ্রে আঘাত প্রতিঘাত করিতে লাগিল, এবং কেবল সেই ধ্বনির বেগে সমস্ত জনমণ্ডলী বক্ষকবাট থর থর করিয়া স্পন্দিত হইয়া উঠিল। কত কৌশল, কত কারুকার্য, উদয়নারায়ণ নামের কতরূপ ব্যাখ্যা, রাজার নামাক্ষরের কত দিক হইতে কতপ্রকার বিন্যাস, কত ছন্দ কত যমক। পুণ্ডরীক যখন শেষ করিয়া বসিলেন, কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধ সভাগৃহ তাহার


কন্ঠের প্রতিধ্বনি ও সন্ত্র হৃদয়ের নির্বাক বিস্ময়রাশিতে গম গম করিতে লাগিল। বহু দূরদেশ হইতে আগত পণ্ডিতগণ দক্ষিণ হস্ত তুলিয়া উচ্ছসিত স্বরে সাধু সাধু রিয়া উঠিলেন। তখন সিংহাসন হইতে রাজা একবার শেখরের মুখের দিকে চাহিল। শেখরও ভক্তি প্রণয় অভিমান এবং একপ্রকার সকরুণ সংকোচপূর্ণ দৃষ্টি রাজার দিকে প্রেরণ


করিল এবং ধীরে ধীরে উঠিয়া দাঁড়াইল' রাম যখন লােকরঞ্জনার্থে দ্বিতীয়বার অগ্ি পরীক্ষা করিতে চাহিয়াছিলেন তখন সীতা যেন এইরূপভাবে চাহিয়া এমনি করিয়া তাহার স্বামীর সিংহাসনের সম্মুখে দাঁড়াইয়াছিলেন।


কবির দৃষ্টি নীরবে রাজাকে জানাইল, আমি তােমারই। তুমি যদি বিশ্ব সমক্ষে আমাকে দাঁড় করাইয়া পরীক্ষা করিতে চাও তাে করাে। কিন্তু তাহার পরে নয়ন নত করলেন। পুণ্ডরীক সিংহের মতাে দাঁড়াইয়াছিল, শেখর চারিদিকে ব্যাধবেষ্টিত হরিণের মতাে দাঁড়াইল। তরুণ যুবক, রমণীর ন্যায় লজ্জা এবং স্নেহ-কোমল মুখ, পাণ্ডুবর্ণ


কপােল, শরীরাংশ নিতান্ত স্বল্প—দেখিলে মনে হয়, স্পর্শমাত্রেই সমস্ত দেহে যেন


বীণার তারের মতাে কাপিয়া বাজিয়া উঠিবে। শেখর মুখ না তুলিয়া প্রথমে অতি মৃদুস্বরে আরপ্ত করিলেন। প্রথম


একটা


শ্লোক বােধহয় কেহ ভালাে করিয়া শুনিতে পাইল না। তাহার পরে ক্রমে ক্রমে মুখ তুলিলেন যেখানে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিলেন সেখান হইতে যেন সমস্ত জনতা এবং রাজসভার পাষাণ প্রাচীর বিগলিত হইয়া বহু দূরবর্তী অতীতের মধ্যে বিলুপ্ত হইয়া গেল। সুমিষ্ট পরিষ্কার কন্ঠস্বর কাপিতে কাপিতে উজ্জ্বল অগ্নিশিখার ন্যায় উধ্রে


উঠিতে লাগিল। প্রথমে রাজার চন্দ্রবংশীয় আদিপুরুষের কথা আরম্ভ করিলেন। ক্রমে ক্রমে কত যুদ্ধবিগ্রহ, শৌর্যবীর্য, যোগদান, কত মহানুষ্ঠানের মধ্যে দিয়া তাহার রাজকাহিনীকে বর্তমান কালের মধ্যে উপনীত করিলেন। অবশেষে সেই দূরস্মৃতিবদ্ধ দৃষ্টিকে ফিরাইয়া আনিয়া রাজার মুখের উপর স্থাপিত করিলেন এবং রাজ্যের সমস্ত প্রজাহৃদয়ের একটা বৃহৎ অব্যক্ত প্রীতিকে ভাষায় ছন্দে মূর্তিমান করিয়া সভার মাঝখানে দাঁড় করাইয়া দিলেন যেন দূর-দূরান্তের হইতে শত সহস্র প্রজা হৃদয় স্রোত ছুটিয়া আসিয়া রাজপিতামহদিগের এই অতিপুরাতন প্রাসাদকে মহাসংগীতে পরিপূর্ণ করিয়া তুলিল ইহার প্রত্যেক ইষ্টককে যেন তাহারা স্পর্শ করিল, আলিঙ্গন করিল, চুম্বন করিল, উর্দ্ধে অন্তঃপুরের বাতায়নসম্মুখে উথিত হইয়া রাজলক্ষ্মীস্বরূপা প্রাসাদলক্ষ্মীদের চরণতলে স্নেহার্দ্রতা ভক্তিভরে লুষ্ঠিত হইয়া পড়িল, এবং সেখান হইতে ফিরিয়া আসিয়া রাজাকে এবং রাজার সিংহাসনকে মহামহােল্লাসে শতশতবার প্রদক্ষিণ করিতে লাগিল। অবশেষে বলিলেন, "মহারাজ বাক্যেতে হার মানিতে পারি, কিন্তু ভক্তি হারাইবে।” এই বলিয়া কম্পিত দেহে বসিয়া পড়িলেন। তখন অশ্রুজলে অভিষিক্ত প্রজাগণ জয় জয়' রবে আকাশ কাপাইতে লাগিল। সাধারণ জনমণ্ডলীর এই উন্মত্ততাকে ধিক্কারপূর্ণ হাস্যের দ্বারা অবজ্ঞা করিয়া


পুণ্ডরীক আবার উঠিয়া দাঁড়াইলেন। দৃপ্ত গর্জনে জিজ্ঞাসা করিলেন, “বাক্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কে?" সকলে স্তব্ধ হইয়া গেল। তখন তিনি নানা ছন্দে অদ্ভুত পাণ্ডিত্য প্রকাশ করিয়া বেদ বেদান্ত আগম নিগম হইতে প্রমাণ করিতে লাগিলেন—বিশ্বের মধ্যে বাক্যই সর্বশ্রেষ্ঠ। বাক্যই সত্য, বাক্য ব্রহ্মন। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর বাক্যের বশ, অতএব বাক্য তাহাদের অপেক্ষা বড়াে। ব্রহ্মা চারি মুখে বাক্যকে শেষ করিতে পারিতেছেন না। পঞ্চানন পাঁচ মুখে


বাক্যের অন্ত না পাইয়া অবশেষে নীরবে ধ্যানপরায়ণ হইয়া বাক্য খুঁজিতেছেন। এমনি করিয়া পাণ্ডিত্যের উপর পাণ্ডিত্য এবং শাস্ত্রের উপর শাস্ত্র চাপাইয়া বাক্যের জন্য একটা অভ্রভেদী সিংহাসন নির্মাণ করিয়া বাক্যকে মর্ত্যলােক এবং সুরলােকে মস্তকের উপর বসাইয়া দিলেন এবং পুনর্বার বজ্র নিনাদে জিজ্ঞাসা করিলেন,


"বাক্যের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কে?” দর্পভরে চতুর্দিকে নিরীক্ষণ করিলেন; যখন কহ কোনে, উত্তর দিল না তখন ধীরে ধীরে আসন গ্রহণ করিলেন। পণ্ডিতগণ সাধু সাধু' ধন্য-ধন্য কমিতে লাগিল,


রাজা বিস্মিত হইয়া রহিলেন এবং কবি শেখর এই বিপুল পাণ্ডিত্যের নিক


আপনাকে ক্ষুদ্র মনে করিলেন। আজিকার মতাে সভা ভঙ্গ হইল। পরদিন শেখর আসিয়া গান আরম্ভ করিয়া দিলেন—বৃন্দাবনে প্রথম বাঁশি


বাজিয়াছে, তখনাে গােপিনীরা জানে না কে বাজাইল, জানে না কোথায় বাজিতেছে, একবার মনে হইল, দক্ষিণ পবনে বাজিতেছে, একবার মনে হইল, উত্তরে গিরিগােবর্ধনের শিখর হইতে ধ্বনি আসিতেছে। মনে হইল উদয়ার্চলের উপরে দাঁড়িয়ে কে মিলনের জন্য আহ্বান করিতেছে, মনে হইল, অস্তাচলের প্রান্তে বসিয়া কে বিরহশােকে কাদিতেছে, মনে হইল, যমুনার প্রত্যেক তরঙ্গ হইতে বাঁশি বাজিয়া উঠিল, মনে হইল, আকাশের প্রত্যেক তারা যেন সেই বাঁশির ছিদ্র অবশেষে কুঞ্জে কুঞ্জে, পথে ঘাটে, ফুলে ফলে, জলে স্থলে, উচ্চে নীচে, অন্তরে বাহিরে বাঁশি সর্বত্র বাজিতে লাগিল—বাঁশি কী বলিতেছে তাহা কেহ স্থির করিতে পারিল না এবং বাঁশির উত্তরে হৃদয় কী বলিতে চাহে তাহাও কেহ স্থির করিতে পারিল না; কেবল দুটি চক্ষু ভরিয়া অশ্রুজল জাগিয়া উঠিল এবং একটি অলোেকসুন্দর শ্যামস্মিগ্ধ মরণের আকাঙ্ক্ষা সমস্ত প্রাণ যেন উৎকন্ঠিত হইয়া উঠিল।


সভা ভুলিয়া, রাজা ভুলিয়া, আত্মপক্ষ প্রতিপক্ষ ভুলিয়া, যশ-অপযশ জয়পরাজয় উত্তর-প্রত্যুত্তর সমস্ত ভুলিয়া, শেখর আপনার নির্জন হৃদয়কুঞ্জের মধ্যে যেন একলা দাঁড়াইয়া এই বাঁশির গান গাহিয়া গেলেন। কেবল মনে ছিল একটি জ্যোতির্ময়ী মানসী মূর্তি, কেবল কানে বাজিতেছিল দুটি কমলচরণের নূপুরধ্বনি। কবি যখন গান শেষে করিয়া হতজ্ঞানের মতাে বসিয়া পড়িলেন তখন একটি অনির্বচনীয় মাধুর্যে, একটি বৃহৎ ব্যাপ্ত বিরহব্যাকুলতায় সভাগৃহ পরিপূর্ণ হইয়া রহিলকেহ সাধুবাদ দিতে পারিল না। এই ভাবের প্রবলতার কিঞ্চিত উপশম হইল পুণ্ডরীক সিংহাসনসম্মুখে


উঠিলেন। প্রশ্ন করিলেন, রাধাই বা কে, কৃষ্ণই বা কে ?” বলিয়া চারি দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন এবং শিষ্যদের প্রতি চাহিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া পুনরায় প্রশ্ন করিলেন, "রাধাই বা কে, কৃষ্ণই বা কে ?” বলিয়া অসামান্য পাণ্ডিত্য বিস্তার করিয়া আপনি তাহার উত্তর আরম্ভ করিলেন। বলিলেন, রাধা প্রণব ওঁকার, কৃষ্ণ ধ্যানযােগ, এবং বৃন্দাবন দুই ভূতের মধ্যবর্তী বিন্দু। ইড়া, সুষুম্না, পিঙ্গলা, নাভিপদ্ম, হৃৎপদ্ম, ব্রহ্মরন্ধ্র, সমস্ত আনিয়া ফেলিলেন।


"রা' অর্থেই বা কী, 'ধা' অর্থেই বা কী, কৃষ্ণ শব্দের ক' হইতে মূর্ধন্য 'ণ' পর্যন্ত প্রত্যেক অক্ষরের কত প্রকার ভিন্ন ভিন্ন অর্থ হতে পারে, তাহার একে একে মীমাংসা করিলেন। একবার বুঝাইলেন, কৃষ্ণ যজ্ঞ, রাধিকা অগ্নি; একবার বুঝাইলেন, কৃষ্ণ বেদ এবং রাধিকা ষড়দর্শন; তাহার পরে বুঝাইলেন, কৃষ্ণ শিক্ষা এবং রাধিকা দীক্ষা। রাধিকা তর্ক, কৃষ্ণ মীমাংসা; রাধিকা উত্তরপ্রত্যুত্তর, কৃষ্ণ জয়লাভ। এই বলিয়া রাজার দিকে, পণ্ডিতদের দিকে এবং অবশেষে তীব্র হাস্যে শেখরের


দিকে চাহিয়া পুণ্ডরীক বসিলেন। রাজা পুণ্ডরীকের আশ্চর্য ক্ষমতায় মুগ্ধ হইয়া গেলেন, পণ্ডিতদের বিস্ময়ের সীমা রহিল না এবং কৃষ্ণ রাধার নব নব ব্যাখ্যায় বাঁশির গান, যমুনার কল্লোল, প্রেমের মােহ একেবারে দূর হইয়া গেল; যেন পৃথিবীর উপর হইতে কে একজন বসন্তের সবুজ রঙটুকু মুছিয়া লইয়া আগাগােড়া পবিত্র গােময় লেপন করিয়া গেল। শেখর আপনার এতদিনের সমস্ত গান বৃথা বােধ করিতে লাগিলেন; ইহার পরে তাহার আর গান গাহিবার সামর্থ রহিল না। সে দিন সভা ভঙ্গ হইল।


পরদিন পুণ্ডরীক ব্যস্ত এবং সমস্ত, দ্বিব্যস্ত এবং দ্বিসমস্তক, বৃত্ত, তা্ক্য, সৌত্র, চক্র, পদ্ম, কাকপদ, আদ্যুত্তর, মধ্যোত্তর, বাক্যোত্তর, শ্লোকোত্তর, বচনগুপ্ত, মাত্রাচ্যুতক, চ্যুতদত্তাক্ষর, অর্থগুড়, স্ততিনিন্দা, অপহৃতি, শুদ্ধাপভ্রংশ, শাব্দী, কালসার, প্রহেলিকা প্রভৃতি অদ্ভুত শব্দচাতুরী দেখাইয়া দিলেন। শুনিয়া সভাসুদ্ধ লােকে বিস্ময় রাখিতে স্থান পাইল না।


শেখর যে-সফল পদ রচনা করিতেন তাহা নিতান্ত সরল তাহা সুখে দুঃখে উৎসবে আনন্দে সর্বসাধারণে ব্যবহার করিত। আজ তাহারা স্পষ্ট বুঝিতে পারিল, তাহাতে কোনাে গুণপনা নাই; যেন তাহা ইচ্ছা করিলেই তাহারাও রচনা করিতে পারিত, কেবল অনভ্যাস অনিচ্ছা অনবসর ইত্যাদি কারণেই পারে না—নহিলে কথাগুলাে বিশেষ নূতন নহে দূরূহও নহে, তাহাতে পৃথিবীর লােকের নূতন একটা শিক্ষাও হয় না সুবিধাও হয় না। কিন্তু, আজ যাহা শুনিল তাহা অদ্ভুত ব্যাপার, কাল যাহা শুনিয়াছিল তাহাতেও বিস্তর চিন্তা এবং শিক্ষার বিষয় ছিল। পুণ্ডরীক পাণ্ডিত্য ও নৈপুণ্যের নিকট তাহাদের আপনার কবিটিকে নিতান্ত বালক ও সামান্য লােক


বলিয়া মনে হইতে লাগিল। মৎস্যপুচ্ছের তাড়নায় জলের মধ্যে যে গূঢ় আন্দোলন চলিতে থাকে,


সরােবরের পদ্ম যেমন তাহার প্রত্যেক আঘাত অনুভব করিতে পারে, শেখর তেমনি তাহার চতুর্দিকবর্তী সভাস্থ জনের মনের ভাব হৃদয়ের মধ্যে বুঝিতে পারিলেন। আজ শেষ দিন। আজ জয়পরাজয় নির্ণয় হইবে। রাজা তাহার কবির প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। তাহারুঅর্থ এই 'আজ নিরুত্তর হইয়া থাকিলে চলিবে না, তােমার যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে হইবে।


শেখর শ্রান্তভাবে উঠিয়া দাঁড়াইলেন; কেবল এই কটি কথা বলিলেন,


"বীণাপাণি, শ্বেতভূজা, তুমি যদি তােমার কমলবন শূন্য করিয়া আজ মল্লভূমিতে


আসিয়া দাঁড়াইলে তবে তােমার চরণাসক্ত যে ভক্তগণ অমৃতপিপাসী তাহাদের কী গতি হইবে।”মুখ ঈষৎ উপরে তুলিয়া করুণস্বরে বলিলেন, যেন শ্বেতভূজা বীণাপাণি নতনয়নে রাজান্তঃপুরে জালায়ন সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তখন পুণ্ডরীক সশব্দে হাস্য করিলেন, এবং শেখর-শব্দের শেষ দুই অক্ষর গ্রহণ করিয়া অনর্গল শ্লোক রচনা করিয়া গেলেন। বলিলেন, “পদ্মবনের সহিত খরের কী সম্পর্ক এবং সংগীতের বিস্তার চর্চা সত্ত্বেও উক্ত প্রাণী কিরূপ ফললাভ


করিয়াছে। আর, সরস্বতীর অধিষ্ঠান তাে পুণ্ডরীক, মহারাজের অধিকারে তিনি


কী অপরাধ করিয়াছিলেন যে, এ দেশে তাহাকে খরবাহন করিয়া অপমান করা


হয়েছে।” পণ্ডিতেরা এই প্রত্যুত্তর উচ্চস্বরে হাসিতে লাগিল। সভাসদেরাও তাহাতে যােগ দিল তাহাদের দেখাদেখি সভাসুদ্ধ সমস্ত লােক, যাহারা বুঝিল এবং না বুঝিল, সকলেই হাসিতে লাগিল।


ইহার উপযুক্ত প্রত্যুত্তরে রাজা তাহার কবিসখাকে বার বার অঙ্কুশের ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টির দ্বারা তাড়না করিতে লাগিলেন। কিন্তু, শেখর তাদের প্রতি কিছুমাত্র মনােযােগ না করিয়া অটলভাবে বসিয়া রহিলেন।


তখন রাজা শেখরের প্রতি মনে মনে অত্যন্ত রুষ্ট হইয়া সিংহাসন হইতে নামিয়া আসিলেন এবং নিজের কণ্ঠ হইতে মুক্তোর মালা খুলিয়া পুণ্ডরীকের গলায় পরাইয়া দিলাম—সভাস্থ সকলেই 'ধন্য ধন্য করিতে লাগিল। অন্তঃপুর হইতে এক কালে অনেকগুলি বলয় কঙ্কণ নূপুরের শব্দ শুনা গেল তাহা শুনিয়া শেখর আসন ছাড়িয়া উঠিলেন এবং ধীরে ধীরে সভাগৃহ হইতে বাহির হইয়া গেলেন। কৃষ্ণচতুর্দশীর রাত্রি। ঘন অন্ধকার। ফুলের গন্ধ বহিয়া দক্ষিণের বাতাস উদার



বিশ্ববন্ধুর ন্যায় মুক্ত বাতায়ন দিয়া নগরের ঘরে ঘরে প্রবেশ করিতেছে, ঘরের কাষ্ঠমঞ্চ হইতে শেখর আপনার পুঁথিগুলো পাড়িয়া সম্মুখে পাকার করিয়া রাখিয়াছেন। তাহার মধ্য হইতে বাছিয়া বাছিয়া নিজের রচিত গ্রন্থ গুলি পৃথক করিয়া রাখিলেন। অনেক দিনকার অনেক লেখা। তাহার মধ্যে অনেকগুলি রচনা তিনি নিজেই প্রায় ভুলিয়া গিয়াছিলেন। সেগুলি উল্টাইয়া পাল্টাইয়া এখানে ওখানে পড়িয়া দেখিতে লাগিলেন। আজ তাহার কাছে ইহা সমস্তই অকিঞ্চিৎকর বলিয়া বোধ হইল।


নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, সমস্ত জীবনের এই কি সঞ্চয়। কতগুলাে কথা এবং ছন্দ এবং মিল!”ইহার মধ্যে যে কোনাে সৌন্দর্য, মানবের কোনাে চির-আনন্দ, কোনাে বিশ্বসংগীতের প্রতিধ্বনি, তাহার হৃদয়ের কোনাে গভীর আত্মপ্রকাশ নিবন্ধ হইয়া আছেআজ তিনি তাহা দেখিতে পাইলেন না। রােগীর মুখে যেমন কোনাে খাদ্য রুচে না তেমনি আজ তাহার হাতের কাছে যাহা কিছু আসিল সমস্তই ঠেলিয়া ফেলিয়া দিলেন। রাজার মৈত্রী, লােকের খ্যাতি , হৃদয়ের দুরাশা কল্পনার কুহক আজ অন্ধকার রাত্রে সমস্তই শূন্য বিড়ম্বনা বলিয়া ঠেকিতে লাগিল।


তখন একটি একটি করিয়া তাহার পুঁথি ছিড়িয়া ঝুলন্ত অগ্নিভাণ্ডে নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। হঠাৎ একটা উপহাসের কথা মনে উদয় হইল। হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “বড় বড়াে রাজারা অশ্বমেধ যজ্ঞ করিয়া থাকেন আজ আমার এ কাব্য মেধ যজ্ঞ!" কিন্তু, তখনি মনে উদয় হইল, তুলনাটা ঠিক হয় নাই। “অশ্বমেধের অশ্ব যখন সর্বত্র বিজয়ী হইয়া ফিরিয়া আসে তখনি অশ্বমেধ হয় আমার কবিত্ যেদিন পরাজিত হইয়াছে আমি সেইদিন কাব্যমেধ করিতে বসিয়াছে—আরে বহুদিন পূর্বে করিলেই ভালাে হয়।”


একে একে নিজের সকল গ্রন্থ গুলো অগ্নিতে সমর্পণ করিলেন। আগুন ধূ ধূ করিয়া জুলিয়া উঠিলে কবি সবেগে দুই শূন্য হস্ত শূন্যে নিক্ষেপ করিতে করিতে বলিলেন, “তোমাকে দিলাম, তােমাকে দিলাম, তােমাকে দিলাম, হে সুন্দরী অগ্নিশিখা, তােমাকেই দিলাম। এতদিন তােমাকেই সমস্ত আরতি দিয়া আসিতেছিলাম, আজ একেবারে শেষ করিয়া দিলাম। বহুদিন তুমি আমার হৃদয়ের মধ্যে জুলিতেছিলে, হে মােহিনী বহিনি রূপিণী, যদি সােনা হইতাম তাে উজ্জ্বল হইয়া উঠিতাম কিন্তু আমি তুচ্ছ তৃণ, দেবী, তাই আজ ভক্ত হইয়া গিয়াছি।”


রাত্রি অনেক হইল। শেখর তাহার ঘরের সমস্ত বাতায়ন খুলিয়া দিলেন। তিনি যে যে ফুল ভালােবাসিতেন সন্ধ্যাবেলা বাগান হইতে সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিলেন। সবগুলি সাদা ফুল জুঁই বেল এবং গন্ধরাজ। তাহারই মুঠা মুঠা লইয়া নির্মল বিছানার উপর ছড়াইয়া দিলেন। ঘরের চারিদিকে প্রদীপ জ্বালাইলেন। তাহার পর মধুর সঙ্গে একটা উদ্ভিদের বিষরস মিশাইয়া নিশ্চিন্তমুখে পান করিলেন এবং ধীরে ধীরে আপনার শষ্যায় গিয়া শয়ন করিলেন। শরীর অবশ্য এবং


নেত্র মুদ্রিত হইয়া আসিল।


নুপুর বাজিল, দক্ষিণের বাতাসের সঙ্গে কেশগুচ্ছের একটা সুগন্ধ ঘরে প্রবেশ


করিল।


কবি নিমীলিত নেত্র কহিলেন, “দেবী ভক্তের প্রতি দয়া করিলে কি? এত দিন পরে আজ কি দেখা দিতে আসিলে?”


একটি সুমধুর কণ্ঠে উত্তর শুনিলেন, "কবি, আসিয়াছি। শেখর চমকিয়া উঠিয়া চক্ষু মেলিলেন; দেখিলেন শয্যার সম্মুখে এক অপরূপ


রমণীমূর্তি।


মৃত্যুসমাচ্ছন্ন বাষ্পকুল নেত্রে স্পষ্ট করিয়া দেখিতে পাইলেন না। মনে হইল, তাহার হৃদয়ের সেই ছায়াময়ী প্রতিমা অন্তর হইতে বাহির হইয়া মৃত্যুকালে তাহার মুখের দিকে স্থিরনেত্রে চাহিয়া আছে।


রমণী কহিলেন, “আমি রাজকন্যা অপরাজিতা।” কবি প্রাণপণে উঠিয়া বসিলেন।


রাজকন্যা কহিলেন, “রাজা তােমার সুবিচার করেন নাই। তােমারই জয় হয়েছে, কবি, তাই আমি আজ তােমাকে জয়মাল্য দিতে আসিয়াছি। বলিয়া অপরাজিতা নিজের কণ্ঠ হইতে স্বহস্তরচিত পুষ্পমালা খুলিয়া কবির গলায় পরাইয়া দিলেন। মরণাহত কবি শষ্যার উপরে পড়িয়া গেলেন।





শেষ

No comments:

Post a Comment

সুন্দরবনে শিকার অভিযান

 সুন্দরবনে শিকার অভিযান নীরাজনা ঘোষ অজয় বিজয় দুই বন্ধু। দুজনে এখন একই কলেছে পড়ে। বি.এস.সি। একই সময় কলেজে আসে, পাশাপাশি বসে। পড়াশোনা ভাল...