রাক্ষসী ও রাজকন্যা
শ্যামলী দাশ
দেশে ছিল এক রাক্ষসী, দিনে জলে বাস করত আর রাত্রে বেরিয়ে মানুষ খেতাে। কয়েক বছরের মধ্যেই সেই রাজ্যের রাজা প্রজা সবাইকে সাবড় করে ফেললাে। ঐ রাজ্যে রাজার এক সুন্দরী ছােট মেয়ে ছিল। রাক্ষসীর মন চাইল না তাকে খেতে। মেয়েটিকে নিয়ে গিয়ে জলের তলায় নিজের ঘরে রেখে দিল। দিনের পর দিন, মাসের পর বছর ঘুরে গেল।
মেয়েটিও বড় হতে লাগল। রাজকন্যার মাথায় ছিল লম্বা চুল। একদিন নদীতে স্নন করার সময় চুল ছিড়ে গেল। সে ঐ চুল একটি কাঠের কৌটোয় করে ভাসিয়ে দিল।
কৌটোটি ভাসতে ভাসতে অন্য দেশের তীরে গিয়ে পৌছাল। সেই দেশের রাজপুত্র শিকারে যাওয়ার পথে কৌটোটি পেলাে, খুলে দেখলাে তাতে বারাে হাত লম্বা চুল। তার শিকারে যাওয়া হলাে না।
ফিরে এলাে রাজপ্রসাদে। নিজের ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। খাওয়া দাওয়া বন্ধ। অনেক ডাকাডাকি করেও কেউ দরজা খােলাতে পারল না। রাজপুত্র এবং মন্ত্রীপুত্রের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীপুত্র দরজায় ধাক্কা দিয়ে
ডেকে তুললাে রাজপুত্রকে। রাজপুত্র বলল, আগে তুমি প্রতিজ্ঞা কর আমি যা চাইব তা এনে দেবে। মন্ত্রীপুত্র অগত্যা তাই করল। তারপর দরজা খুলে বলে, এই চুল যে মেয়ের তাকে এনে দিতে হবে। আমি তাকেই বিয়ে করব। তারপর জলস্পর্শ করব।
মন্ত্রীপুত্র বলল, এ আর এমন কী কাজ। এরজন্য এত দুশ্চিন্তার কি আছে? তুমি খাওয়া দাওয়া কর, আমি নিজে এনে দেব ঐ কন্যাকে। রাজপুত্র খাওয়া দাওয়া করল।
মন্ত্রীপুত্র রাজার কাছে গিয়ে বলল, হুজুর। বারােশ ছুতাের ডেকে রাতারাতি একটি মন পবন নৌকা তৈরী করতে আদেশ দিন।
রাজার নির্দেশে বারােশ ছুতােরকে ধরে আনা হলাে। রাজা হুকুম দিলেন কাল সকালের মধ্যে একটি মন পবন নৌকা বানিয়ে দাও। না পারলে সকলের দেহ থেকে মুন্ডু কেটে নেওয়া হবে। রাজার আদেশ শুনে সবাই ভয়ে হতাশায় ভেঙ্গে পড়ল।
কাজটা অত সহজ হবে না তা সবাই জানে। রাজার কথা শুনে ফেরার পথে এক বুড়াে ছুতাের ক্লান্ত হয়ে এক গাছের নিচে গুড়ির ওপর মাথা রেখে শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবছেন। সে নিশ্চিত যে পরের দিন সকাল হলে তার গর্দান যাবে।
ওই গাছে বাস করত এক শকুনি। শকুনি ফিরে এলে তার বাচ্চারা খিদের জ্বালায় ডাকাডাকি শুরু করল। বাচ্চাদের সান্ত্না দিতে শকুনি বলল, আজ যা এনেছি তাই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়। কাল বারােশ ছুতার মারা যাবে। কাল তােদের পেট ভরে খাওয়াবাে।
আর যাইহােক ওরা কোনক্রমেই মন পবন নৌকা বানাতে পারবে না। কোন কাঠে যে হবে তা ওরা জানবে কি করে? বাচ্চারা বলল, কোন কাঠে হবে বলনা মা? শকুনি বলল, আমরা যে গাছে বাস করছি, একমাত্র এই গাছের কাঠ দিয়ে হবে।
বুড়াে ছুতাের এ কথা শুনে ধড়ে প্রাণ পেল। ছুটে গিয়ে অন্য ছুতােরদের গিয়ে বলল, চল ঐ গাছের কাঠ দিয়ে নৌকা বানিয়ে রাজার ভেট দিয়ে আসি।
রাজপুত্র সকালে উঠে দেখে নৌকা প্রস্তুত। রাজপুত্র এবং মন্ত্রীপুত্র মন পবন নৌকা নিয়ে পৌছে রাক্ষসের আঙিনায়। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। রাক্ষসী বেরিয়েছে খাবারের সন্ধানে। রাজকন্যা ওদের দেখে বলল, সর্বনাশ এক্ষুনি ঐ নৌকা লুকিয়ে ফেল, রাক্ষসী দেখতে পেলে রক্ষে নেই। মন্ত্রীপুত্র রাজকন্যাকে সব কথা জানালাে।
সকাল হতে না হতেই রাক্ষসী ফিরে এল। তার আসার আগেই ওদের দুজনকে বানিয়ে দিল দুই মাছি, দুজনে মাছি হয়ে একটা শিকের ওপর বসে রইল।
রাক্ষসী এসেই মানুষের গন্ধ পেয়ে বলল, হ্যারে! মানুষের গন্ধ পাচ্ছি যেন, কেউ এনেছে নাকি? এখানে আবার মানুষ আসবে কোথেকে। মানুষ বাতে তাে
আমিই আছি। খেতে চাও, আমাকে খাও। রাক্ষসী জিভ কেটে বলে, বালাই যাট। অমন কথা কোন দিন মুখে আনিসনি। আমি মরে যাই তাও আচ্ছা....... | সন্ধ্যে হতেই রাক্ষসী বেরিয়ে যায়। তার যাওয়ার পর রাজকন্যা রাজপুত্র আর মন্ত্রীপুত্রকে মানুষ করে দেয়। আর রাক্ষসী আসার আগে আবার ওদের মাছি বানিয়ে দেয়। দিনের পর দিন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এদিকে দিনের পর দিন কাটে কিন্তু এখান থেকে পালাবার কোন পথ খুঁজে পায় না।
একদিন মন্ত্রীপুত্র রাজকন্যাকে বলল, রাক্ষসী ফিরে এলে যখন তার সেবা করবে সেই সময়ে কেঁদে অভিনয় করে তার মৃত্যুর উপায়টা জেনে নেবে।
রাজকন্যা সেইমত সেদিন রাক্ষসীর গা পা টিপতে টিপতে কাদতে লাগলাে। তা দেখে রাক্ষসী বলল, মরে যাই, বাছা আমার, কাদছিস কেন? কিসের দুঃখ তাের? কি চাই বল? আকাশের চাঁদ চাস? তাই এনে দেবাে। কেন কাদিস বল? না মা আমি ভাবছি তােমার তাে বয়স হচ্ছে, তুমি মরে গেলে আমার কি হবে? কে আমার দেখাশুনা করবে? খবর নেবে।
সেই কথা মনে হলেই আমার কান্না পায়। রাক্ষসী তার কথা শুনে হেসে কুটি পাটি হয়। বলে ওরে আমি এখনই মরছি না। তাের কোন চিন্তা নেই। আমার মৃত্যুর রহস্য আমিই জানি শুধু। তােকে বলে রাখি আমাদের উঠোনে একটা লােহার সিন্দুক পাঁতা আছে।
তার ভেতরে একটা মরচে ধরা শাবল আছে : সেটা দিয়ে মাথার পিছনে আঘাত করলে এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে যদি না পড়ে তবেই আমার মৃত্যু বুঝলি? একারাে পক্ষে সম্ভব নয়। নে মন খারাপ করিস না বলে
নিজে হাতে রাজকন্যার চোখের জল মুছিয়ে দেয় রাক্ষসী। ওদিকে রাজপুত্র আর মন্ত্রীপুত্র মাছি হয়ে সব শুনেছে। সন্ধ্যে বেলা রাক্ষসী বেরিয়ে যেতেই মাটি খুঁড়ে সিন্দুক থেকে শাবল বের করে লুকিয়ে রাখে।
সকালে রাক্ষসী ফিরে প্রতি দিনের মত একই কথা জিজ্ঞাসা করে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তখন মন্ত্রীপুত্র পা টিপে টিপে গিয়ে রাক্ষসীর মাথায় আঘাত করে কিন্তু রক্ত মাটিতে
পড়ল না। পড়লাে বিছানায়, শেষে রাক্ষসী মরে গেল। তারপর রাজপুত্র ও মন্ত্রীপুত্র রাজকন্যাকে এবং রাক্ষসীর যত সােনাদানা ধন দৌলত ছিল সব নিয়ে দেশে রওনা দিল। সেখানে রাজা মন্ত্রী, রাজ্যের সবাই তাদের স্বাগত জানালাে। একটি শুভ দিন দেখে রাজকন্যার সাথে রাজপুত্রের বিয়ে হয়ে গেল আর রাজ্যের সবাই সেই খুশিতে যােগ দিল।

No comments:
Post a Comment