শ্বেতপুরী আর লাল পুরী
সুকুমার রায়
ত্রিপুরার রাজা আর লালপুরীর রাজা, দুজনের যেমন পাশাপাশি বাড়ি, তেমনি গলাগলি ভাব। শ্বেতপুরী বলে, “আমার ছেলে যখন বড় হবে, তখন তােমার মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে দেব!”লালপুরী বলে, "আমার মেয়ের যখন বয়স হবে, তখন তােমার ছেলেকে আমার জামাই করে।” আর দুজনেই বলে, “আহা, রানীরা যদি আজ বেঁচে থাকতেন।”
এমনি করে দিন কেটে যায়। হঠাৎ একদিন কোথেকে এক শিকারী এসে রাজপুরীতে অতিথি হল। সে বলে এমন দেশ নেই সে দেখেনি। সেই সােনার দেশের কাজল নদী, তার ওপারে রক্তমুখো অসভ্যেরা থাকে, সেখানে সে হরিণ মারতে গিয়েছে; নীলসাগরের মধ্যিখানে ছায়ায় ঢাকা রত্নদীপ, সেখানে সে মুক্তো আনতে গেছে, ঐ যে পুরীর সামনে পৃথিবীজোড়া গভীর বন, সেই বনের ওপারে গিয়ে সে অদ্ভুত দৃশ্য দেখে এসেছে।
সকলে বলল, “অদ্ভুত দৃশ্যাটা কিরকম? শিকারী বলল, দেখতে পেলাম ঝরনাতলায় বনের বুড়ি, মাথায় তার সােনার চুল। সেই চুল দিয়ে বুড়ি রূপাের তাঁতে কাপড় বুনছে! চকচকে, ঝকঝকে, ফিনফিনে, ফুরফুরে চমংকার কাপড় তেমন কাপড় এ রাজ্যে নেই, কোথাও নেই।” সে রাত্রে রাজাদের চোখে আর ঘুম এলো না। তারা শুয়ে শুয়ে কেবলই
ভাবছে, আহা! সে কাপড় যদি কিছু আনতে পারতাম। শেষটায় শ্বেতপুরীর আর সহ্য হল না-উঠে লালপুরীর ঘরে গিয়ে বলল লালপুরী ভাই, জেগে আছ?” লালপুরী বলল,“হ্যা ভাই সেই কাপড়ের কথা ভেবে ভেবে আমার আর ঘুম আসছে ”। শ্বেতপুরী বলল, "আমারও সেই দশা, চল না দুজনে চুপচাপ বেরিয়ে পড়ি।”
লালপুরী বলল,বেশ কথা। দেখা যাক, সেই বুড়ির সন্ধান পাওয়া যায় কি না।” শ্বেতপুরী চুপচাপ গিয়ে রাজভান্ডারীর কানে কানে বলল, “তদবির সিং, আমি কয়দিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি, তুমি সাবধানে সব সামলে থেকো, আর রাজকুমারকে চোখে চোখে রেখে।” লাল পুরী তার বাপের আমলের বুড়াে চাকরকে জাগিয়ে
বলল, "নিকমরাম, আমি কয়দিন একটু ঘুরে আসছি, তুমি আমার মেয়েকে দেখাে। তারপর দুজনে বুড়ির খোঁজে বনের মধ্যে গেল। সেই যে গেল আর তাদের খবর নেই। দুদিন যায়, দশদিন যায়, এমনি করে সাত মাস গেল।
তখন দুষ্ট তদবির সিং নিমকরামকে লােভ দেখিয়ে বলল, “দাদা, বুড়াে হয়ে পড়লে, আর কয়দিনই বা বাঁচবে! এখন এই বয়সে একটু জিরিয়ে নাও। তােমা' নদীর ধারে ঘর দিচ্ছি, বাগান দিচ্ছি, চাকর-দাসী সব দিচ্ছিশেষ কটা দিন আরামে থাক। মেয়েটাকে দেখাশােনা, সে আমার গিন্নি কবে।" এই বলে নিমকরামকে ভুলিয়েভালিয়ে পাঠিয়ে দিল, পুরী থেকে অনেক দূরে।
দিন যতই যায়, রাজকন্যা আর রাজপুত্রের ততই কষ্টে বাড়ে। ক্রমে এমন হল যে তারা ভালাে করে খেতেই পায় না, ছেড়া ময়লা কাপড় পরে, নােংরা ঘরে মাদুর পেতে শােয়। ভান্ডারীটার ছেলে-মেয়ে, ভাইপাে-ভাগনে, ভাইঝি ভাগনি, মাসি পিসি আর মেসাে-পিসে, তারা সব দলেবলে পুরীতে এসে থাকে। ভালাে ঘর সব তারাই নেয়, ভালাে কাপড় সব তারাই পরে, ভালাে খাবার সব তারাই খায়। শেষটায় একদিন নিমকরামের গিন্নি এসে রাজপুত্র আর রাজকন্যাকে পুরীর বাইরে তাড়িয়ে দিলাে।
বলল, "যা যা, বসে বসে আর খেতে হবে না; মাঠে গিয়ে শুয়াের চরা। যদি ভালাে করে চরাস আর একটাও শুয়োর না হারায়, তাহলে বিকেলে চারটি ভাত পাবি। রাত্রে ঐ হােগলার ঘরে শুয়ে থাকিস।” দুজনে বনের ধারে, মাঠের মধ্যে শুয়াের চরাতে গেল। একটা শুয়াের ভারি
দুষ্ট কেবলই পালাতে চায়। রাজপুত্র তাকে ধরে এনে লাঠি দিয়ে খুচিয়ে বললেন, খবরদার! এইখানে চোখ বুজে শুয়ে থাক। নড়েছিস কি করছিস।তারপর দুজনে মিলে গল্প করতে লাগলাে। দুঃখের কথা বলে বলেও ফুরােয় না; এদিকে বেলা যে শেষ হয়ে আসছে, তাদের সে খেয়াল নেই। হঠাৎ রাজপুত্র চেয়ে দেখে দুষ্টু শুয়ােরটা আবার কোথায় পালিয়েছে। কোথায় গেল ? চারদিক চেয়ে দেখে শুয়াের কোথাও
নাই; পালের মধ্যে নাই, মাঠের মধ্যে নাই, পুরীতে যাবার পথেও নাই! তাহলে নিশ্চয় বনের দিকে গেছে, এই ভেবে তারা দুজনে গেল বনের মধ্যে খুঁজে দেখতে। খুঁজতে খুঁজতে, ঘুরতে ঘুরতে, বেলাশেষে যখন তারা শ্রান্ত হয়ে পড়লাে তখন চেয়ে দেখেকোথায মাঠ, কোথায় পুরী, তারা গভীর বনে এসে পড়েছে। দেখে তাদের বড় ভয় হল, বনের মধ্যে কোথায় যাবে? এমন সময়ে আঁধার বন
ঝলমলিয়ে বনের দেবী চন্দ্রাবতী তাদের সামনে এসে বললেন, "ভয় পেয়েছে? এসাে, এসাে, আমার ঘরে এসে!" তারা তার সঙ্গে গেল।
বনের মধ্যে প্রকাণ্ড যে বুড়াে বট, তার জটায় ঢাকা বিশাল দেহে চন্দ্রাবতী আঙুল দিয়ে ছুঁতেই গাছের গায় দরজা খুলে গেল। সেই দরজা দিয়ে রাজপুত্র আর রাজকন্যা ভেতরে ঢুকে দেখলাে, কি চমৎকার পুরী! সেইখানে হরিণের দুধ আর
বনের ফল খেয়ে তারা সবুজ চাদরটাকা কচি ঘাসের নরম বিছানায় ঘুমিয়ে পড়লাে। ভােরের বেলা গাছের ফোকরের জানালা দিয়ে এক টুকরাে দিনের আলাে যেমনি এসে পুরীর মধ্যে পড়েছে, অমনি পাখিরা সব গেয়ে উঠলাে? রাজার ছেলে আর রাজার মেয়ে অবাক হয়ে উঠে বসলাে। চন্দ্রাবতী বললেন, এখন ভেবে বল দেখি, আমার কাছে থাকবে, না রাজপুরীতে ফিরে যাবে?”
তারা দুজনেই মাথা নেড়ে বলল, “না, না, দুষ্টু পুরীতে আর কক্ষনাে যাব না। তার চাইতে বনের পুরী অনেক ভালো।
সেই থেকে রাজপুত্র আর রাজকন্যা বনপুরীতেই সুখে থাকে। বনের যত পশুপাখি, চন্দ্রাবতীকে সবাই চেনে। তারা সে তার সঙ্গে দেখা করে, গল্প করে আর কত মজার মজার কথা বলে; দুজনে অবাক হয়ে সেইসব শােনে। একদিন এক বুড়াে কাক, জানালা দিয়ে উড়ে এসে সিন্দুকের ওপর আরাম করে বসে বলল, কাঃ কাঃ, ক্যায়া বাৎ! চন্দ্রা বললেন, এই যে, ভুসুন্ডি দাদা যে! খবরটবর কিছু আছে? কাক বলল, হ্যা খবর বেশ ভালােই। কাঠুরেরা সে বছর যত জঙ্গল কেটেছিল, সব আবার ভরিয়ে দেবার ব্যবস্থা হচ্ছে। চন্দ্রা বললেন, 'সে কিরকম ?" কাক বলল, শহরের মানুষ এসে সারাদিন খালি মাটি খুড়ছে আর বীজ লাগাচ্ছে, আবার নতুন বীজ খুঁজে আনছে। চন্দ্রা বললেন, তারা এরকম করছে কেন?’ কাক বলল, ওমা, তাও জান না? তােমার এই নন্দনবন পার হলেই খন্ডবন, তারপরে অন্ধবন।
মানুষ পুরের লোকেরা এসে সেই অন্ধ বোনের বড়-বড় গাছ কেটে নিয়েছে। তাই অন্ধরাজ দুটো জাদরেল মানুষ পাকড়াও করে তাদের নিয়ে বন সারাচ্ছেন। চন্দ্রা বললেন, আহা, তা হলে তাে মানুষ বেচারিদের বড় কষ্ট। কাক বলল, তা কষ্ট তাে আছেই। ঘরবাড়ি, ছেলেপুলে, সব ছেড়ে বনে খাটছে, খাটছে, কেবলই খাটছে। যতদিন না কাটা জঙ্গলের সমস্ত জমিতে বীজ পোঁতা হয়, যতদিন না সেই বীজ থেকে চারা বেরােয়, যতদিন না সেই চারা বাড়তে বাড়তে গাছ হয়ে ওঠে, ততদিন
তাদের ছুটি নেই। বলে কাক উড়ে গেল। কাকের কথা শুনে রাজপুত্র আর রাজকন্যা কাদতে লাগলাে। তারা বলল, আমরা অন্ধবনে যাব, আমাদের পথ বলে দাও। চন্দ্রা বললেন, নদীর ধার দিয়ে দিয়ে উত্তরমুখী চলে যাও, তাহলেই অন্ধবন খুজে পাবে। তার কাছেই ভুষুক্ডি কাক থাকে, সে তােমাদের পথ দেখাবে। সত্যি কথা ছাড়া আর কিছু বলবে না। নদীর জল ছাড়া আর কোন জল খাবে না। কোন গাছের ফুল ছিড়বে না, ফল পাড়বে নাতা হলেই তােমাদের কোন বিপদের ভয় নেই।
ভােরবেলা দুজনে একটি বনরেশমের কম্বল আর পুটুলি ভরে খাবার সঙ্গে নিয়ে রওনা হল। দুপুরবেলা তারা শ্রান্ত হয়ে নদীর ধারে জল খেতে গেছে। তখন কোথা থেকে এক শিকারি এসে হাজির। সে বলল, আরে ছিছি, ঐ নােংরা জল কি খেতে আছে? এই নাও, বরফ দেওয়া ঠান্ডা জল। তারা বলল, না, নদীর জল ছাড়া আর কোন জল আমরা খাব না। শিকারি রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেল। রাত্রি হলে শুকনাে ঘাসের ওপর কম্বল পেতে দুজনে ঘুমিয়ে রইলাে, পরের
দিন ভাের না হতে আবার উঠে রওনা হল। সেদিনও যেই তারা নদীর ধারে খেতে বসেছে, অমনি এক শিকারি এসে তাদের বলছে, আরে ওসব বাসি পিঠে খাচ্ছ কেন? চমকার ফল রয়েছে, যত ইচ্ছা পেড়ে পেড়ে খাও। তারা বলল, না আমরা বনের ফুল ছিড়ব না, বনের ফল পাড়ব না। শিকারি রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেল। পরের দিন আবার যেই তারা নদীর ধারে বসেছে, অমনি এক শিকারি এসে তাদের আদর করে, মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলাে, তােমরা কোথায় যাচ্ছ?
তারা বলল, আমরা অন্ধবনে যাচ্ছি। শিকারি বলল, আরে চুপ চুপ, অন্ধরাজা
শুনতে পেলেই সর্বনাশ। ওরকম বলতে নেই কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলবে, কোথাও
যাচ্ছি না, এই নদীর ধারে বেড়াচ্ছি। তারা বলল, 'না, আমরা সত্যি কথা ছাড়া আর কোন কথা বলব না। তার পরের দিন তারা অন্ধবন দেখতে পেল। বনের মধ্যে অনেকখানি জায়গা ময়দানের মতাে খােলাকাঠুরেরা সেখানে জঙ্গল কেটে সাফ করেছে। সেই খােলা ময়দানে শ্বেতপুরী আর লালপুরীর রাজা শাবল দিয়ে মাটি খুড়ছে। তাদের দেখতে পেয়েই রাজপুত্র আর রাজকন্যা বাবা, বাবা', বলে দৌড়ে গেল। কিন্তু রাজারা কিন্তু
তাদের দিকে ফিরেও চাইলাে না। ছেলে আর মেয়ে কত বলল, কত বােঝালাে, তারা সে-সব কথা কানেও নিলাে না। তারা কেবল মাটি খুড়ছে আর নিজেরা বলাবলি করছে যে, এই জমিটা শেষ হলেও আবার বীজ আনতে যেতে হবে।
রাজপুত্র আর রাজকন্যা অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইলো, তারপর বিষগ্ন মুখে নদীর ধারে এসে বসলাে। এমন সময়ে বুড়াে ভূষুক্ডিকাক এসে তাদের সামনে ঘাসের উপর বসে বলল, কঃ, কঃ-ভাবনা কিসের, কও না শুনি। তারা সব কথা খুলে বলল। কাক বলল, এরই জন্য এত ভাবনা? তা হলে বলি শােন। যখন ঐ পাহাড়ের ওপর রাঙা সূর্য ডুবে যাবে, তখন মানুষেরা তাদের কাজ-কর্ম রেখে বিশ্রাম করবে। তখন যদি চটপট গিয়ে শাবল দুটোকে নদীর জলে ফেলতে পার, তা হলেই তারা কাজের কথা সব ভুলে যাবে। তারপর তাদের সামনে গিয়ে বলবে ঝরনাতলায় আপন মনে, কোথায় বুড়ি কাপড় বােনে? রুপাের তাতে সোনার চুল, সব কি ফঁকি, সব কি ভুল?বললেই সব কথা তাদের মনে পড়ে যাবে। যা দেখছো এ-সমস্তই অন্ধরাজের ফাকি সেই শিকারি সেজে তােমাদের পুরীতে গিয়েছিল, আর বনের পথে তােমাদের ভােলাতে চেয়েছিল। যাও সন্ধ্যা হয়ে এলাে, এখনই দৌড়ে যাও।
তারা দুজনে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে দেখলাে সূর্য অস্ত যায় যায়। একটু পরেই রাজারা যেমন শাবল রেখে দিয়ে বিশ্রাম করতে বসেছে, অমনি তারা শাবল দুটো নিয়ে এক দৌড়ে গিয়ে নদীর মধ্যে ফেলে দিল। তারপর ফিরে এসে যেই তারা সেই ভুষুন্ডির শেখানাে কথাগুলাে বলেছে, অমনি লালপুরী আর শ্বেতপুরী লাফিয়ে উঠে বলল, আরে এ কি! তােমরা কোথা থেকে এলে? বনের মধ্যে আসলে কি করে? এত রােগা হয়ে গেছ কেন? তােমাদের সঙ্গে লােকজন কোথায়? আমাদের খবর পেলে কারকাছে?' তারা একে একে সব কথা বলল। তারপর তারা চারজনে মনের আনন্দে হাসতে হাসতে কাদতে কাদতে পুরীতে ফিরে চলল।
তারপর কি হল? তারপর সবাই পুরীতে ফিরে এলাে, আমােদ-আহলাদ, ভােজ উৎসব লেগে গেল। তারপর? তারপর একদিন লালপুরীর রাজকন্যার সঙ্গে শ্বেতপুরীর রাজপুত্রের ধুমধাম করে বিয়ে হল বনের দেবী চন্দ্রাবতী নিজে এলেন বিয়ে দেখতে। আর হতভাগা তৎবির সিং-এর কি হল? তাকে অন্ধবনে পাঠিয়ে দেওয়া হলআজও সেখানে সে তার গিন্নির সঙ্গে কেবল মাটি খুড়ছে আর বীজ পুতছে আর বনে-জঙ্গলে বীজ খুজে বেড়াচ্ছে।

No comments:
Post a Comment